ধর্মান্ধতা-ময় রাজনীতির যুগে শিক্ষার গুরুত্ব

 ধর্মান্ধতা-ময় রাজনীতির যুগে শিক্ষার গুরুত্ব:-


বর্তমান সময়ে ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনীতি করা অনেক রাষ্ট্রেই সাধারণ ঘটনা হয়ে উঠেছে। ধর্মান্ধতা যখন রাজনীতির হাতিয়ার হয়, তখন তা সমাজকে কুসংস্কার, বিভেদ ও অন্ধ বিশ্বাসের অন্ধকারে ঠেলে দেয়। এ অবস্থায় শিক্ষাই একমাত্র উপায় যা মানুষকে যুক্তিবাদী, ন্যায়পরায়ণ ও প্রগতিশীল চিন্তার পথে পরিচালিত করতে পারে।


১. ধর্মান্ধতা ও তার প্রভাব


ধর্মান্ধতা (fanaticism) তখনই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, যখন এটি যুক্তির জায়গা দখল করে নেয়। এর ফলে—


1.সমাজে সহিষ্ণুতা নষ্ট হয়, মানুষের মাঝে বিভেদ বাড়ে।


2.একদল মানুষ নিজেদের শ্রেষ্ঠ বলে দাবি করে, অন্যদের অধিকার খর্ব করে।


3.বিজ্ঞান ও মুক্তচিন্তার পরিসর সংকুচিত হয়, যার ফলে জাতির সামগ্রিক অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়।


4.গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কারণ যুক্তির বদলে আবেগপ্রবণ ধর্মীয় স্লোগান রাজনৈতিক ফায়দার হাতিয়ার হয়ে ওঠে।



২. শিক্ষার গুরুত্ব: ধর্মান্ধতার প্রতিষেধক


শিক্ষাই পারে মানুষকে অন্ধ বিশ্বাস থেকে মুক্ত করে যুক্তিবাদী ও মানবিক করে তুলতে।


1.যুক্তিবাদী চিন্তা গড়ে ওঠে: শিক্ষা মানুষকে চিন্তার স্বাধীনতা দেয় এবং যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেয়।


2.সহিষ্ণুতা ও বহুত্ববাদ শেখায়: প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে বোঝায় যে, মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক এবং সকলের বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া প্রয়োজন।


3.বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়: কুসংস্কার ও মিথ্যা প্রচার রোধ করতে হলে বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তা ও বিশ্লেষণী ক্ষমতা জরুরি।


4.গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের চর্চা সহজ হয়: শিক্ষিত জনগণ বুঝতে পারে, ধর্মকে ব্যবহার করে বিভেদ তৈরির চেষ্টা করা হলে তা সমাজের জন্য ক্ষতিকর।


৩. ধর্মগ্রন্থে শিক্ষার গুরুত্ব


বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে শিক্ষার গুরুত্ব বারবার তুলে ধরা হয়েছে:


কোরান:


"যারা জানে আর যারা জানে না, তারা কি সমান?" (সূরা যুমার: ৯)


"পড়ো, তোমার প্রভুর নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।" (সূরা আলাক: ১)


হাদিস:


"জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্য ফরজ।" (ইবন মাজাহ)


গীতা:


"জ্ঞানের আলো অজ্ঞানের অন্ধকার দূর করে।"


বাইবেল:


"আমার লোকেরা জ্ঞানের অভাবে ধ্বংস হয়ে যায়।" (হোশেয়া ৪:৬)


রামায়ণ ও মহাভারত:


শিক্ষার অভাবে রাবণ ও দুর্যোধনের মতো চরিত্ররা নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনে।


৪. সমসাময়িক প্রেক্ষাপট ও শিক্ষিত সমাজের করণীয়-


ধর্মান্ধতা-ময় রাজনীতির যুগে শিক্ষিত ব্যক্তিদের কর্তব্য


ধর্মান্ধ রাজনীতির যুগে শিক্ষিত ব্যক্তিদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তারা সমাজের বিবেক, যারা কুসংস্কার ও বিভ্রান্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যুক্তি, মানবতা ও প্রগতির পথ দেখাতে পারেন। যদি শিক্ষিত সমাজ নীরব থাকে, তবে ধর্মান্ধতার শেকড় আরও গভীরে বিস্তার লাভ করবে।


১. যুক্তিবাদ ও বিশ্লেষণধর্মী চিন্তা প্রচার করা


ধর্মান্ধ রাজনীতি সাধারণত অন্ধবিশ্বাস ও আবেগকে কাজে লাগিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করে।


শিক্ষিত ব্যক্তিরা যদি যুক্তিনির্ভর চিন্তার প্রসার ঘটান, তাহলে সমাজের মানুষ কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে।


বই, প্রবন্ধ, বক্তৃতা, আলোচনা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যৌক্তিক ও তথ্যভিত্তিক বক্তব্য উপস্থাপন করা উচিত।


২. গোঁড়ামি ও অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো


ধর্মান্ধ রাজনীতি মানুষের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করে, যা সমাজে বিদ্বেষ ও হানাহানির জন্ম দেয়।


শিক্ষিত ব্যক্তিদের উচিত সম্প্রীতি, সহিষ্ণুতা ও মানবিক মূল্যবোধ প্রচার করা।


ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক উসকানির বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।



৩. গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মানবাধিকারের পক্ষে কাজ করা


ধর্মকে ব্যবহার করে যখন রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করা হয়, তখন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।


শিক্ষিত সমাজের দায়িত্ব হলো গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের পক্ষে সরব হওয়া।


ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা ও ন্যায়বিচারের পক্ষে অবস্থান নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।



বাইবেল:

"সত্য জানবে, আর সত্য তোমাদের মুক্ত করবে।" (যোহন ৮:৩২)


৪. তরুণ প্রজন্মকে সচেতন করা


তরুণদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে হবে, যাতে তারা ধর্মান্ধ রাজনীতির ফাঁদে পা না দেয়।


স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে মুক্তচিন্তার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।


তরুণদের ইতিহাস, বিজ্ঞান ও দর্শনের জ্ঞান দিতে হবে, যাতে তারা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সমৃদ্ধ হতে পারে।


৫. নৈতিকতা ও মানবিকতা রক্ষা করা


শিক্ষিত ব্যক্তিরা যদি নৈতিকতা ও মানবিকতার মডেল হয়ে ওঠেন, তাহলে তারা সমাজের জন্য আদর্শ হতে পারেন।


শুধুমাত্র ব্যক্তিগত উন্নতি নয়, সমাজের উন্নতির জন্যও কাজ করতে হবে।


ধর্মের প্রকৃত বার্তা হচ্ছে মানবতার কল্যাণ, তাই ধর্মের অপব্যবহার প্রতিরোধ করা শিক্ষিতদের কর্তব্য।


মহাভারত:

"যে ব্যক্তি অন্যের কল্যাণ করে, প্রকৃতপক্ষে সেও কল্যাণ লাভ করে।"



আজকের বিশ্বে ধর্মান্ধতা ও উগ্রবাদের প্রবণতা বাড়ছে। তাই শিক্ষাকে আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে:


1. ধর্মনিরপেক্ষ ও বৈজ্ঞানিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা।


2. ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।


3. সমাজে যুক্তিবাদী ও নৈতিক শিক্ষার প্রচার করা।


4. মিডিয়া ও সামাজিক মাধ্যমে ধর্মীয় উগ্রতা ঠেকাতে শিক্ষামূলক প্রচারণা চালানো।



উপসংহার


ধর্মান্ধতা-ময় রাজনীতির যুগে শিক্ষাই সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। ধর্মের প্রকৃত উদ্দেশ্য কখনোই অন্ধবিশ্বাস ছড়ানো নয়, বরং শিক্ষা ও প্রজ্ঞার আলোয় মানুষকে আলোকিত করা। তাই, কুসংস্কার ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হলে আমাদের শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষাই মুক্তি।

Comments

Popular posts from this blog

বাঘের মুখোশটা খুলে, নিজেকে দেখেছো কখনো?

শিক্ষার্থী

Cry for the Future